‘আমার
বুকের ভিতর চারবার চিরিক দিয়া উঠলো। প্রথমবার কেন মুখে পানি দিলাম না, তার
আগেই চলে গেল। আমি কেমন পাষাণ মা? আমি মরে গেলে জিজ্ঞেস করবে মা আমারে
পানিও খাওয়াইলা না, আমি কী জবাব দেবো?’
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে
ঈদের পর দিন রোগী এবং তাদের স্বজনদের কেমন ঈদ কাটলো- এমন প্রতিবেদন তৈরির
উপাদান খুঁজতে গিয়ে সন্তানহারা এ মায়ের প্রশ্নের জবাব মেলেনি।
দুপুর
গড়াতে মায়ের বুকটা ধরপর করে উঠে। নাক-মুখে অক্সিজেন লাগানো থাকলেও কয়েকবার
জোরে নিঃশ্বাস নেয় ছেলেটি। পাশে ছিলেন বাবা জহিরুল, বোনও। এরপরই নিস্তব্ধ
ছেলে। চিকিৎসক-নার্স বুকে চাপ দিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাসে সহায়তা করলেও আর
পারেননি শ্বাস বের করতে।
বারবার চিৎকার করে অশ্রুশূন্য নয়নে আহাজারি
করছিলেন ১৫-১৬ বছর বয়সী ছেলের মা। মায়ের আহাজারি আর বাবার নিঃশব্দ কান্না
আবেগে আপ্লুত করেছিল হাসপাতালের ১০২ নম্বর ওয়ার্ডের দায়িত্বরত চিকিৎসক,
নার্স এবং অন্যান্য রোগী ও স্বজনদেরও।
টাঙ্গাইল শহরের পূর্ব
আদালতপাড়া এলাকার জহিরুলের ছেলে ফখরুল। মা ‘ফখরুল ফখরুল’ বলে কাঁদছিলেন। -
তার এক স্বজন বাংলানিউজের কাছে অভিযোগ করে বলেন, কয়েক দিন আগে টাঙ্গাইল শহরে পুলিশের সঙ্গে গণ্ডগোল হয় স্থানীয় ছেলেদের। ঘটনার পর পুলিশ হন্য হয়ে খুঁজে মূল আসামিকে না পেয়ে তার বন্ধু ফখরুলকে পায়। পুলিশ তার গায়ে পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে। বুক, চোখের নিচে এবং দু’পায়ে দুটি গুলি লাগে ফখরুল।
ওয়ার্ডেই দাঁড়িয়ে থাকা দু’জন পুলিশ সদস্যকে উদ্দেশ্য করে গালাগাল করেন নিহতের মা। ‘যে পুলিশ আমার ছেলেকে গুলি করেছে তার সন্তানও যেন...।’ তখন পুলিশও ছিলেন নিরুত্তর।
আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে এই পরিবারের ঈদের আনন্দ কেমন ছিল তা জানা না গেলেও ঈদের পর দিন যে নিহতের মা-বাবা-বোনের চোখে-মুখে বিষাদের ছাপ, তা স্পস্ট ছিল। প্রশ্ন করলেও তার মা-বাবা কোনো উত্তর দেননি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঈদের দুদিন আগে পুলিশের সঙ্গে গণ্ডগোলে এক পুলিশ সদস্য মারা যায়। হাসপাতালে নিহত এই কিশোর সেই মামলার আসামি।
নিহতের ওই স্বজন আক্ষেপ করে বলেন, পুলিশ অন্যায় প্রতিশোধ নিল।
কুমিল্লার তিতাস থানার তিন নম্বর বলরামপুর ইউনিয়নের কানাই গোবিন্দপুর গ্রামের কাজী রফিকুল ইসলাম, পেশায় শিক্ষক। ঈদের দিন সকাল ১০টার দিকে এলাকার বখাটে ছেলেদের মারামারি থামাতে গিয়ে চাপাতির কোপে নিজেই আহত হন। পঞ্চাশোর্ধ রফিকুলের বাম কাঁধ ও বুকের বাম পাশে বেশ গুরুতর আঘাত লেগেছে। এরপরই ঈদের দিন তার স্থান হয় হাসপাতালের বিচানা। শিক্ষক রফিকুল ইসলাম বলেন, নেশা করা নিয়ে মারামারি, এই নেশা ডুবাল তরুণ সমাজকে। নেশার জন্য ঈদের সময় হাসপাতালে পড়ে আছি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগরের ঢালপাড় গ্রামের ইউসুফ আলীর প্রতিবেশীরা পূর্ব শত্রুতার জের ধরে বল্লম দিয়ে বুকে আঘাত করে। ঈদের নামাজের পরই আহত
হয়ে হাসপাতালে আসেন ইউসুফ, তার সঙ্গে ভায়রা আব্দুল আহাদসহ আরও তিনজন রয়েছেন।
মঙ্গলবার সন্ধ্যার দিকে ঢামেক হাসপাতালের ১০২ নম্বর ওয়ার্ডে আসেন তারা।
আহত ইউসুফের স্বজন আব্দুল আহাদ বাংলানিউজকে বলেন, ওইটা কাইজা গ্রাম। একবার মারামারি শুরু হইলে চলতে থাকে।
ঈদের দিন সবাই আনন্দে থাকলেও ইউসুফ এবং আহাদ হাসপাতালে বন্দি! আগামী ঈদে বন্দি থাকতে চান না তারা, ঈদ আনন্দ উদযাপন করতে চান পরিবার, প্রতিবেশী আর আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে।
-

0 comments:
Post a Comment